Child Health Services, disease

অ্যাকিউট লিম্ফোসাইটিক লিউকোমিয়া

অ্যাকিউট লিম্ফোসাইটিক লিউকোমিয়া কী
লিউকেমিয়া একটি মারণ রোগ যেখানে কোষ যা সাধারণত লিম্ফোসাইটিস হিসাবে বৃদ্ধি পায় তা পরবর্তীকালে ক্যান্সারে পরিণত হয়। দ্রুত অস্থিমজ্জাস্থিত স্বাভাবিক কোষকে ক্যান্সার আক্রান্ত কোষে প্রতিস্থাপন করে।
তীব্র লিম্ফোসাইটিক লিউকোমিয়া (সব ধরনের) সমস্ত বয়সের মানুষের হতে পারে। তবে এই রোগী শিশুদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশি দেখা যায়। ১৫ বছরের চেয়ে ছোট ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের ২৫% এই ধরনের ক্যান্সার।
এই রোগটি ২ থেকে ৫ বছর বয়সের শিশুদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশি দেখা যায়। সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই রোগটি ৪৫-এর চেয়ে বেশি বয়স্ক মানুষের হয়ে থাকে।
এ ক্ষেত্রে অপূর্ণাঙ্গ লিউকোমিয়া কোষ অস্থি মজ্জায় জমে। স্বাভাবিক রক্ত কোষ তৈরি করে এমন কোষকে ধ্বংস এবং প্রতিস্থাপন করে। লিউকেমিয়া কোষ লোসিকার দ্বারা যকৃৎ, প্লিহা, লোসিকা নোড, মস্তিষ্ক ও টেস্টিস-এ বাহিত হয়। সেখানে তারা বৃদ্ধি পায় ও ভাঙতে থাকে। তারা মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের ওপরের তন্তুকে উদ্দীপ্ত করে যার ফলে জ্বালা অনুভূত হয় (মেনিনজাইটিস) এবং রক্তাল্পতা, যকৃৎ এবং কিডনির কাজে অক্ষমতা এবং অন্যান্য অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

রোগের লক্ষণ ও রোগ নির্ণয়
প্রাথমিক লক্ষণ হল অস্থিমজ্জা যথেষ্ট স্বাভাবিক রক্ত কোষ তৈরি করতে অক্ষম হয়।
খুব অল্প শ্বেত রক্ত কণিকা থাকার ফলে জ্বর এবং অতিরিক্ত ঘাম হয়। যেটি সংক্রমণ নির্দেশ করে। দুর্বলতা, ক্লান্তি, এবং ঝিমুনি যেটি রক্তাল্পতা নির্দেশ করে। খুব অল্প লোহিত কণিকা থাকার ফলে এমনটা হয়ে থাকে।
খুব অল্প অনুচক্রিকা থেকে সহজে দাগ এবং রক্তক্ষরণ, নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ অথবা মাড়ির রক্তক্ষরণ হতে পারে। মস্তিষ্কে লিউকোমিয়া কোষ মাথা ব্যাথা, বমি এবং উদ্দীপনা ঘটায় এবং অস্থি মজ্জাতে লিউকোমিয়া কোষ হাড় এবং সন্ধিগুলিতে ব্যাথা ঘটাতে পারে। কখনও কখনও লিউকোমিয়া কোষ যকৃৎ এবং প্লিহা বড় করে দেয় যার ফলে পেট-ভর্তি ভাব এবং ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
রক্ত পরীক্ষা, অর্থাৎ রক্তে কণিকার সংখ্যার হিসাব এই রোগটির প্রথম প্রমাণ দিতে পারে।
শ্বেত রক্ত কণিকার মোট সংখ্যা স্বাভাবিক, কম অথবা বৃদ্ধি পেতে পারে, কিন্তু লোহিত কণিকা ও অনুচক্রিকার সংখ্যা প্রায় সব সময়ই কম হয়।
এর সঙ্গে একটি মাইক্রোস্কোপে রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে খুব অপূর্ণাঙ্গ শ্বেত রক্ত কণিকা দেখতে পাওয়া যায়।
সঠিক ভাবে রোগ নির্ণয় করতে এবং এটিকে অন্যান্য ধরনের লিউকোমিয়ার থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে প্রায় সব সময় অস্থি মজ্জার বায়পসি করা হয়। .
এই রোগের চিকিৎসা যখন ছিল না, তখন যাঁদের এই রোগ হত তাঁদের অধিকাংশই রোগ নির্ণয়ের ৪ মাসের মধ্যে মারা যায়। বর্তমানে শিশু রোগাক্রান্তদের প্রায় ৮০% এবং বয়স্ক রোগাক্রান্তদের ৩০ থেকে ৪০% আরোগ্য লাভ করে।
অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে কেমোথেরাপির প্রথম পর্যায়ে রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা (সম্পূর্ণ সুস্থ) সম্ভব হয়।
৩ থেকে ৭ বছর বয়সের শিশুদের সব চেয়ে বেশি সেরে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। ২ বছরের চেয়ে ছোট শিশু এবং অপেক্ষাকৃত প্রাপ্তবয়স্কদের সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কম। শ্বেত রক্ত কণিকার মোট সংখ্যা ও লিউকোমিয়া কোষে নির্দিষ্ট ক্রমোজমের বৈশিষ্টগত ব্যতিক্রম ফলাফলকে প্রভাবিত করে।

চিকিৎসা
কেমোথেরাপি খুবই কার্যকর এবং পর্যায়ক্রমে দেওয়া হয়। শুরুতে এই চিকিৎসার উদ্দেশ্য (প্রাথমিক কেমোথেরাপি) হল লিউকোমিয়া কোষ ধ্বংস করার মাধ্যমে রোগ কমানো যাতে স্বাভাবিক কোষ অস্থি মজ্জায় পুনরায় বৃদ্ধি পেতে পারে।
রোগীকে অল্প দিন অথবা কিছু সপ্তাহের জন্য হাসপাতালে থাকতে হতে পারে। এটা নির্ভর করছে কত তাড়াতাড়ি অস্থি মজ্জা আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। রক্তাল্পতা ও রক্তক্ষরণ চিকিৎসা করতে রক্ত এবং অনুচক্রিকা প্রতিস্থাপন প্রয়োজনীয় এবং ব্যক্টিরিয়া সংক্রমণ চিকিৎসা করতে জীবাণু প্রতিরোধী ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে। শরীরের ক্ষতিকারক জিনিস, যেমন ইউরিক অ্যাসিড, যা লিউকোমিয়া কোষ ধ্বংস হওয়ার সময় নির্গত হয় তার থেকে মুক্তি দেওয়া র জন্য শিরার মধ্যে ওষুধ ইনজেক্ট করে এবং ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়ে থাকে।
বিভিন্ন পরিমাপে ওষুধ ব্যবহার করা হয় এবং মাত্রা একাধিক দিন অথবা সপ্তাহের জন্য দেওয়া হয়। মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের তন্তু স্তরে লিউকোমিয়া কোষের চিকিৎসার জন্য (মেনিঞ্জেস), ক্যান্সাররোধী ওষুধ মেরুদণ্ডের মজ্জায় সরাসরি ভাবে দেওয়া হয়।
মস্তিষ্কে কেমোথেরাপি বিকিরণ থেরাপির সঙ্গে দেওয়া যেতে পারে। এমনকী যখন সামান্য প্রমাণ পাওয়া যায় যে লিউকোমিয়া মস্তিষ্কতে প্রসারিত হয়েছে, তখন ওই চিকিৎসা করা হয় কারণ এর ফলে মেনিঞ্জেসে ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে।
এই ভাবে কিছু সপ্তাহ প্রাথমিক এবং প্রগাঢ় চিকিৎসা করার পরে (দৃঢ় কেমোথেরাপি) অবশিষ্ট লিউকোমিয়া কোষ ধ্বংস করার জন্য অতিরিক্ত চিকিৎসা করা হয়।
অতিরিক্ত কেমোথেরাপি ওষুধ অথবা একই ওষুধ যা প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবহার করা হয়, কয়েক সপ্তাহের জন্য তা ব্যবহার করা যেতে পারে।
পরবর্তী চিকিৎসায় (কেমোথেরাপি রক্ষণাবেক্ষণ) অল্পসংখ্যক ওষুধ লাগে, কখনও কখনও অল্প মাত্রায়, ২ থেকে ৩ বছরের জন্য চালিয়ে যেতে হতে পারে।
কিছু মানুষ যাদের কোষে নির্দিষ্ট ক্রমোজমের পরিবর্তনের কারণে রোগের পুনরার্বিভাবের যথেষ্ট সম্ভাবনা, প্রায়শই সে ক্ষেত্রে স্টেম কোষ প্রতিস্থাপন সুপারিশ করা হয়।
লিউকোমিয়া কোষ পুনরায় তৈরি হতে পারে (এই অবস্থাকে রিল্যাপ্স বলে), রক্ত, অস্থি মজ্জা, মস্তিষ্ক, অথবা শুক্রাশয় বা অণ্ডকোষে। অস্থি মজ্জায় পুনরায় আবির্ভাব বিশেষ ভাবে গুরুতর অবস্থার সৃষ্টি করে।
কেমোথেরাপি পুনরায় দেওয়া হয়। প্রায় সব মানুষই যদিও চিকিৎসাতে সাড়া দেয়, তবুও রোগের ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ ভাবে ২ বছরের চেয়ে ছোট শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে। যখন মস্তিষ্কতে লিউকোমিয়া কোষ পুনরায় আবির্ভূত হয়, কেমোথেরাপি ওষুধ সপ্তাহে ১ থেকে ২ বার সেরিব্রোস্পাইনাল তরলে ইঞ্জেক্সন হিসাবে দেওয়া হয়।
যখন শুক্রাশয় বা অণ্ডকোষে লিউকোমিয়া কোষ পুনরায় দেখা দেয় তখন কেমোথেরাপির সঙ্গে রেডিয়েশন থেরাপিও দেওয়া হয়।
যাদের রোগ পুনরায় দেখা দেয়, অ্যালোজেনিক স্টেম কোষ প্রতিস্থাপনের সঙ্গে উচ্চ মাত্রায় কেমোথেরাপি ওষুধ রোগ সারাতে সব চেয়ে বেশি সহায়তা করে।
যদি স্টেম কোষ এমন এক ব্যক্তির থেকে নেওয়া যায় যার টিস্যুর ধরন রোগীর কোষের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ (এইচএলএ-মিল) তখন কেবল প্রতিস্থাপন করা যাবে ।
দাতা সাধারণত অপত্য হয়, কিন্তু সম্পর্কহীন দাতা থেকেও (অথবা কখনও কখনও পরিবারের সদস্যবৃন্দ অথবা সম্পর্কহীন দাতা থেকে আংশিক ভাবে মিল কোষ, ও অ্যাবিলিক্যাল স্টেম কোষ) কখনও কখনও কোষ নেওয়া যায়।
৬৫ বছরের চেয়ে বেশি বয়সি রোগীদের স্টেম কোষ প্রতিস্থাপন অপেক্ষাকৃত কম করা হয়, কারণ এর সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম এবং পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও মারাত্মক।
রোগের পুনরাগমনের পরে যাদের স্টেম কোষ প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয় তাদের অতিরিক্ত চিকিৎসা অসহনীয় এবং অকার্যকর হয়, ফলে তারা আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে। তবুও সারানো সম্ভব। জীবন-শেষের যত্ন তাদের করা হয় যারা আর চিকিৎসাতে সাড়া দেয় না।

Please follow and like us: