Baby development

শিশুর কান্না, যত ভুল ধারনা

জন্ম হওয়ার সাথে সাথেই যে শিশু কান্না দিয়ে তার উপস্থিতি জানান দেয়, সে কান্নাই তার সুস্থতার লক্ষণ।নচেৎ নাটক সিনেমার মত বাচ্চাকে উল্টো করে ধরে “দুমাদুম দিলো দুচ্চার” করে কাঁদানোর সেই বিখ্যাত দৃশ্য এখন আর করা না হলেও, সাথে সাথে কান্না না করলে ডাক্তারদের টেনশন বাড়ে বইকি কমে না।

জন্মের সাথে সাথেই বাচ্চার কেঁদে ওঠারও আল্লাহ্ এর এক বড় কুদরত। কেন জানেন ? বাচ্চা মায়ের পেটে পানির ভেতর ছিল , সেভাবেই তার শ্বাসপ্রশ্বাস নেয়ার ব্যবস্থা করা ছিল। যখন সে বের হয়ে আসলো, পুরোপুরি নিজের উপর নির্ভরশীল হয়ে গেলো তার শ্বাস নেয়াটা। কান্না দেয়ার ফলে বাচ্চার ফুসফুসের সব পানি সরে গিয়ে বাতাস জায়গা করে নিলো ও স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস নেয়া থেকে শুরু করে হৃদপিণ্ডের রক্তসঞ্চালন সবই যার যার মত কাজ করা শুরু করলো স্বাধীনভাবে। ভাবতে পারেন এই কান্নাটা কত জরুরী ?

এখন, প্রশ্ন হলো জন্মের পরে বাচ্চা কেন কাঁদবে? কখন কাঁদবে? কতক্ষণ কাঁদবে?

আপনার আমার মত বাচ্চা তো আর কথা বলতে জানে না। কাজেই সবকিছুতে তার কান্নাই ভরসা। খিদে লাগলে তো কাঁদবেই, তার যাবতীয় আদর আবদার, ভালো লাগা মন্দ লাগা সবকিছুই সে প্রকাশ করবে কান্না দিয়েই। পরিপূর্ন হাসি দিতেও কিন্তু তার সময় লাগে এক দেড় মাস। সব কান্নাতেই যদি আপনি বাচ্চাকে খাওয়াতে চান তাহলে ব্যাপারটা কেমন হবে?

বাচ্চা হাগুপিসু পেলেও বাচ্চা কাঁদবে স্বাভাবিক। কারন, সে বুঝে এখন সে নোংরা হয়ে যাচ্ছে, তাকে পরিস্কার করতে হবে। বাচ্চা এপাশ থেকে ওপাশ হতে চাইলেও কাঁদবে, বাবার কোলে যেতে চাইলেও কাঁদবে, ঘর থেকে বাইরে যেতে চাইলেও কাঁদবে। কাজেই,

“সব কান্নায় খাবার নয়, আসল কারন আগে বুঝতে হয়। ”

সাধারণত বাচ্চার বুকের দুধ খাওয়ার দেড় থেকে দু’ঘন্টা আগে পেট খালি হয় না। দুধ হজম হতে সময় লাগে এরকমই, তবে চাহিদা সবার এক রকম নাও হতে পারে। কাজেই, এর আগে কান্না দিলো আর আপনি তাকে খাইয়ে দিলেন, বরং বিপদ আরো বাড়ালেন। প্রথমত, জোর করে খাওয়ানো কিন্তু এখান থেকেই শুরু করলেন যা থেকেই একসময় “আমার বাবু খায় না” সমস্যার উৎপত্তি।

তার উপর ভরাপেটে খাওয়ালে বাড়তি দুধটুকুর কি হবে? হয় বাচ্চা বমি করে দিবে নাহলে পেটে বাড়তি দুধ জমে গ্যাস হয়ে পেট ফুলবে, পায়খানা আটকাবে বা সারাদিন গ্যাসের সাথে একটু একটু করে বের হবে। ঘুমের ভেতর খাওয়ালেও একই সমস্যা। এরচেয়েও বড় সমস্যা শুয়ে শুয়ে খাওয়ালে , কিছু দুধ ফুসফুসে ঢুকে যাওয়ার ভয় থাকে। বমি করলেও একই ভয় রয়ে যায়। ফুসফুসে দুধ ঢুকলে তা ঘায়ের সৃষ্টি করে ফলে কফ তৈরী হয়। যার থেকে আপনাদের একটা কমন কমপ্লেইন “কাঁশি ভালো হয় না” এর সৃষ্টি ।

কোথা থেকে ” কি হলো, কবে হলো, কেন হলো”, বুঝা গেলো?

এরপরও একটা নবজাতক শিশু ৩-৪ ঘন্টা টানা কাঁদতে পারে, এটাও স্বাভাবিক। ইনফ্যান্টাইল কলিক বলে একটা টার্ম আছে যা বাচ্চার পেটে গ্যাস হওয়ার জন্য হয়। বাচ্চা বেশী মোড়ামুড়ি করে ও টানা অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করে রাতে। এর কারনটা তো উপরে বলেছি। সমাধান হলো, ঘন ঘন না খাওয়ানো এবং ঢেঁকুর তোলানো।

ঢেঁকুর বাচ্চারা এমনিতেও তুলে। প্রতিবার বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়, মাথা উঁচু করে বসিয়ে খাওয়াবেন, পুরো কালো অংশটুকু যেন বাচ্চার মুখের ভিতর থাকে, নাক খোলা থাকে এবং একেকবারে শুধু একপাশেই খাওয়াবেন ; এভাবে খাওয়ালে বাচ্চার পেটে গ্যাস কম হবে। এভাবে খাওয়ানোর পর বাচ্চাকে কাঁধে নিবেন এমনভাবে যেন তার পেট আপনার কাঁধে হালকা চাপ খায়। কাঁধে নিয়ে হাটবেন এবং কিছুক্ষণ পর পর পিঠ চাপড়ে দিবেন, ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে দেখবেন বাচ্চা ঢেঁকুর তুলবে। কিছু বাচ্চা সাথে সাথে বমিও করে দেয় সেটাও স্বাভাবিক।

কাজেই, যেমন কথায় আছে “না কাঁদলে মা দুধ দেয় না” , তেমনি সব কান্নায় বুকের দুধ দেয়াটাও কোন কাজের কথা নয়।

সবাইকে ধন্যবাদ, পড়ার জন্য।

#শিশুরোগ ( শিশুর কান্না)

ডাঃ লুনা পারভীন
আবাসিক মেডিকেল অফিসার
বহির্বিভাগ, ঢাকা শিশু হাসপাতাল।

Please follow and like us: